নতুন বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি, পুরোনো দুর্নীতির বাস্তবতা
Todaybangladeshnews.com – নত ন বন দ বস ত র – জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন ধারা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন বড় পরীক্ষার মুখে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সরকারি সেবার দুর্নীতি, ঘুষ এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ কমেনি। বরং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে, নাগরিক সেবার দুর্নীতির বিস্তার আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—শুধু সরকার বদলালেই কি বদলায় রাষ্ট্রের পুরোনো সংস্কৃতি, নাকি প্রয়োজন আরও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের?
দুর্নীতির নতুন হিসাব, পুরোনো সমস্যা
২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় পার করা নয়, বরং দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক অনাস্থার জাগা থেকে রাষ্ট্রকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়া। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও দুর্নীতির কাঠামো সহজে বদলায়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘ন্যাশনাল হাউসহোল্ড সার্ভে ২০২৫’ সেই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় এই পরিমাণ বেড়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, অন্তত একটি সরকারি সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ঘুষ এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। তাঁর মতে, সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের একটি বড় অংশ মনে করে ঘুষ দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
জরিপ অনুযায়ী, ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ অভিযোগ করার প্রয়োজন মনে করেননি। তাদের ধারণা ছিল, প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরেই দুর্নীতি এতটা বিস্তৃত যে অভিযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে পাসপোর্ট সেবা, বিচার বিভাগীয় সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং ভূমি প্রশাসন খাতে। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নিম্ন আয়ের মানুষ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর।
নতুন বন্দোবস্তে ছাত্র প্রতিনিধিদের ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল—যে প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেই কাঠামোর ভেতরেই প্রত্যাশিত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও দুর্নীতির সংস্কৃতি বহাল থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যেও। নিজের সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়েও প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কারণ তারা প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে থেকে নতুন ধরনের জবাবদিহিমূলক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব পালনের সময় তাদের নিয়েও নানা বিতর্ক তৈরি হয়। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে প্রকল্প বরাদ্দ, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পর যে ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁর মতে, ছাত্র প্রতিনিধিরা অনেক ক্ষেত্রে রূপান্তরমূলক সংস্কারকের পরিবর্তে প্রচলিত প্রশাসকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবু তাদের মতে, জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির পার্থক্যই সরকারের মূল্যায়নের প্রধান জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি এবং পুরোনো দুর্নীতির বাস্তবতার এই দ্বন্দ্ব এখনো চলমান।

